বছর দু’য়েক আগের কথা। বহুদিন পর আবার পশ্চিমবঙ্গে ফিরেছিলাম—ফিরে আসার আনন্দ তখনও পুরোপুরি মুছে যায়নি। মাত্র এক বছর হয়েছে ফিরে এসেছি, কিন্তু শহরের রঙ, গন্ধ, শব্দ—সব কিছু যেন আবার নতুন করে চেনা শুরু করেছি। সেদিনও ঠিক তেমনই এক দিন। এক বন্ধুর সঙ্গে গিয়েছিলাম বড়বাজার—কলকাতার এক ব্যস্ত, স্পন্দিত প্রাণকেন্দ্র।
শিয়ালদহ স্টেশনে নেমে আমরা হাঁটতে শুরু করলাম। চারপাশে মানুষের ঢল, হকারদের হাঁকডাক, গাড়ির হর্ন—সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত তাড়াহুড়োর শহর। ফ্লাইওভারের নিচ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আমি তখন শহরের এই চেনা বিশৃঙ্খলাকে উপভোগ করছি। আমার বন্ধুটা বেশ তাড়াহুড়োয় ছিল—আমার হাত ধরে প্রায় টেনেই নিয়ে চলেছে। আমি লম্বা পা ফেলে ওর সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলছিলাম, যেন না দৌড়িয়েও দৌড়াচ্ছি।
ঠিক সেই সময়েই ঘটে গেল ঘটনাটা।
হঠাৎ করেই একটি রাস্তার দোকানের সামনে রাখা টেবিলের সঙ্গে আমার গা লেগে গেল। সেখানে রাখা কিছু জিনিস মাটিতে পড়ে গেল। মুহূর্তটা খুব ছোট—কিন্তু তার প্রতিক্রিয়া ছিল বিস্ফোরণের মতো।
আমি সঙ্গে সঙ্গে “Sorry” বলে এগোতে গিয়েছিলাম—কিন্তু ততক্ষণে শুরু হয়ে গেছে হৈচৈ, গালাগাল। দোকানের সামনে বসে থাকা এক ব্যক্তি, যার আচরণে স্পষ্ট রাগ আর দাপট—এক লাফে উঠে এসে আমার জামা খামচে ধরল।
এক টানে আমাকে থামিয়ে দিল সে।
তার চোখে ছিল অভিযােগ নয়—এক ধরনের আধিপত্য। আমার ভুল অবশ্যই ছিল—অসাবধানতায় জিনিস পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু পরিস্থিতি যেন তার চেয়েও বড় হয়ে উঠল।
শুরু হল কথা কাটাকাটি—আমার শান্তভাবে বোঝানোর চেষ্টা, আর তার কড়া সুরে শাসানি। আমি নিজে থেকেই মাটিতে পড়ে যাওয়া জিনিস তুললাম, যথাস্থানে রেখে দিলাম। মনে হল, বিষয়টি এখানেই শেষ হওয়া উচিত।
কিন্তু না—ক্ষমা চাওয়াও যেন যথেষ্ট ছিল না।
শেষ পর্যন্ত দু’হাত জোড় করে ক্ষমা চেয়ে পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেলাম। আমরা আবার হাঁটা শুরু করলাম—কিন্তু সেই মুহূর্তটা আমার মনে এক অদ্ভুত দাগ কেটে গেল। শহরের ব্যস্ততার আড়ালে থাকা এক অস্বস্তিকর বাস্তবতা—যেখানে সহানুভূতির জায়গায় আগ্রাসন এত সহজে জায়গা করে নেয়।
সময়ের সাথে সাথে অনেক কিছুই বদলায়। আজকাল শুনছি, ওই এলাকাগুলিতে হকার উচ্ছেদ চলছে—ফুটপাত খালি করা হচ্ছে। খবরটা শুনে মনে একধরনের অদ্ভুত শান্তি অনুভব করলাম। এর পেছনে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ছায়া হয়তো রয়েছে—তবুও মনে হল, শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার এই প্রয়াস হয়তো প্রয়োজনীয়।

এই শহরকে আমি ভালোবাসি—তার বিশৃঙ্খলাতেও এক ধরনের সৌন্দর্য আছে। কিন্তু সেই সৌন্দর্য যেন কখনো মানবিকতার অভাবে ম্লান না হয়ে যায়।
শিয়ালদহ ফ্লাইওভারের নিচে সেই কয়েক মিনিটের ঘটনা আমাকে শিখিয়েছে—একটি শহরের আসল রূপ শুধু তার রাস্তা বা আলোয় নয়, তার মানুষের আচরণেও লুকিয়ে থাকে।
হয়তো পরিবর্তন দরকার ছিল—আর সেই পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে যদি একটু বেশি মানবিক, সহনশীল শহর গড়ে ওঠে, তবে সেটাই হবে আসল তৃপ্তি।
✍️ সঞ্জয় হিউম্যানিয়া | 19th April 2026 | Salt Lake City, Kolkata


অভিমানী বাবী
বৃষ্টির দিনে সেই প্রথম
Gaighata Tornado 1983 | গাইঘাটা ঘূর্ণিঝড় ১৯৮৩ (চড়ুইগাছি টর্নেডো)
দাদা, লাইনে আছি!
বারাসাতের গলাকাটা বাড়ি
ঘুড়ির আত্মজীবনী: আকাশ ছোঁয়ার গল্প
ইশারার খুনসুটি (অনুগল্প ৪)
ভালোবাসার প্রাপ্তি ( অনু গল্প ৩ )